অপরাধ
শনিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২০ ৫ মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

মুরিদ সেজে পীরকে হত্যার লোমহর্ষক কাহিনী

ওয়ান নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিতঃ ডিসেম্বর ২৮, ২০১৯ , ৩:৪৪ অপরাহ্ন
মুরিদ সেজে পীরকে হত্যার লোমহর্ষক কাহিনী

মাইজভাণ্ডারীর অনুসারী পরিচয় দিয়ে কথিত পীর শাহ তোবারক হোসেন ওরফে পাগলা মামার কাছে আসেন হাসান। তরিকাপন্থি এ যুবকের আচার-ব্যবহার এবং খেদমতে সন্তষ্ট হয়ে রাজধানী শান্তিনিকেতনে নিজ ফ্ল্যাটে তাকে থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন ধনাঢ্য ওই ব্যবসায়ী। সেখানে থাকতেন তার পালক ছেলে মো. সাইফুল ইসলামও (৩১)।

হাসানকে ঠাঁই দেওয়াই কাল হয় মহাখালীর মামা প্লাজার মালিক তোবারকের জন্য। হত্যার মিশন নিয়ে আসা ওই যুবকের হাতেই গত বুধবার খুন হন তিনি। এমনটাই নিশ্চিত করেছে পুলিশের তদন্ত সূত্র।

জানা যায়, ঘটনার রাতে চট্টগ্রামের শফি মাইজভাণ্ডারীর অনুসারী তোবারক ছাড়াও তার ফ্ল্যাটে ছিলেন সাইফুল ও হাসান। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে কলিংবেল বাজায় চার দুর্বৃত্ত। এ সময় ভেতর থেকে দরজা খুলে দেয় হাসান। ঘরে ঢুকেই মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা সাইফুলকে ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে।

এর পর তারা কার্টার ছুরি নিয়ে তোবারকের ওপর হামলা চালায়। কিন্তু সুঠাম দেহের অধিকারী ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে পেরে উঠছিল না হাসানসহ দুর্বৃত্তরা। একপর্যায়ে সবাই মিলে তোবারককে মাটিতে ফেলে বেধড়ক কিলঘুষি মারে এবং থুতনির নিচে ছুরিকাঘাত করলে গলার রগ কেটে যায়। আঘাত খুব বেশি গুরুতর না হলেও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে ওই বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। এর পর আলমারি ভেঙে নগদ টাকাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়ে যায় খুনিরা। আহত সাইফুল কিছুটা সামলে নিয়ে বিষয়টি প্রতিবেশী ও পুলিশকে জানান।

সূত্রটি আরও জানায়, কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারীরা নিহতের পরিচিত ছিলেন। মুরিদ হিসেবে তাদের যাতায়াত ছিল ওই বাসায়। মূলত পীরের কাছে থাকা বিপুল টাকা-পয়সার লোভে পড়ে যায় তারা। রাতারাতি বড়লোক হতে পরিকল্পনা করে তোবারককে হত্যার। সে অনুযায়ীই ঘটনার পাঁচদিন আগে ওই বাসায় আশ্রয় নেয় হাসান। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত সন্দেহে দুজনকে আটকের বিষয় তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র গতকাল নিশ্চিত করেছে। খুনিদের ফেলে যাওয়া একটি মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে বাকি খুনিদেরও শনাক্ত করে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে ঘটনার সঙ্গে এখন পর্যন্ত সাইফুলের সম্পৃক্ততা না পেলেও সন্দেহের বাইরে রাখা হচ্ছে না তাকে। আবার অর্থ লুট, আর্থিক লেনদেন নিয়ে বিরোধ এবং মতাদর্শিক বিরোধের জেরে খুনটি হয়েছে কিনা- সে বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তোবারক হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার পরিদর্শক (অভিযান) মো. ইফতেখার হোসেন অবশ্য বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এখনো তা বলা যাচ্ছে না। তবে হাসান নামে এক যুবক হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত, এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে।

খুনিদের পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সেই অন্য খুনিদের ঘরে ঢুকিয়েছে, কিলিং মিশনেও অংশ নিয়েছে। তাকে গ্রেপ্তার করতে পারলে হত্যার রহস্য জানা যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের পর জিজ্ঞাসাবাদে নিহতের সেবক সাইফুলসহ পরিবারের অন্যদের কাছ থেকে কিছু তথ্য মিলেছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে হত্যায় জড়িত কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। অর্থ লুট ও মতাদর্শিক বিরোধের জের ধরে খুনের ঘটনা ঘটেছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

এদিকে তোবারকের মরদেহ শুক্রবার তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের চরপাড়ার সরকারবাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয়। নিহতের স্ত্রী পারভীন ইসমত আরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তার স্বামীর সহকারী হিসেবে কাজ করতেন সাইফুল। তাকেই হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সন্দেহ করছেন তিনি। মার্কেটের ভাড়া বাবদ উঠা কয়েক লাখ টাকার বেশিরভাগই বাসায় রাখতেন তোবারক। সেই টাকা লুটের জন্যই খুনের পরিকল্পনা করেন সাইফুল।

এ ঘটনায় তার সহযোগী হাসান, সোহাগ, নাইম, জাভেদ ও সোহেলেরও সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে বদ্ধমূল ধারণা তার। তবে মহাখালীর মামা প্লাজা মার্কেটটি নিয়ে মামলা চলমান থাকলেও সে কারণে হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করেন না পারভীন। একই দাবি মামলার বাদী নিহতের ভাই মোবারক হোসেনেরও, টাকা লুটের জন্যই তার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। আর ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে অথবা পরোক্ষভাবে সাইফুলই জড়িত।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) বিপ্লব বিজয় তালুকদার বলেন, ‘হত্যার কারণ সম্পর্কে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আমরা ধারণা করছি, ঘটনায় জড়িতদের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। আশা করছি দুয়েকদিনের মধ্যে ভালো কিছু শোনাতে পারব।’

ওএন/এফ

  • 16
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    16
    Shares
  •  
    16
    Shares
  • 16
  •  
  •  
  •  
  •