ফিচার
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০ ৫ কার্ত্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি যাদের

ডা. হিমেল ঘোষ, চিকিৎসক
প্রকাশিতঃ জুলাই ২, ২০২০ , ৭:৩২ অপরাহ্ন
করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি যাদের

গঠনগতভাবে করোনাভাইরাস একটি বিশাল আরএনএ ভাইরাসের পরিবার। ‘করোনা’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো ‘মুকুট’। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নিচে এ পরিবারের ভাইরাসকে অনেকটা রাজার মাথার মুকুট বা সৌরকিরণের মত দেখায়, এ থেকেই এ নামকরণ হয়েছে। অন্যসব ভাইরাসের মতো এরাও জীবনধারণ ও বংশবৃদ্ধির জন্য কোনো না কোনো একটি প্রাণি কোষের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে।

করোনাভাইরাস রাইবোভিরিয়া পর্বের নিদুভাইরাস বর্গের করোনাভিরিডি গোত্রের অর্থোকরোনাভিরিনা উপ-গোত্রের সদস্য। এরা পজিটিভ সেন্স একক সূত্রবিশিষ্ট আবরণীবদ্ধ বা এনভেলপড ভাইরাস। এদের নিউক্লিওক্যাপসিড সর্পিলাকৃতির। এর জিনোমের আকার সাধারণত ২৭ থেকে ৩৪ কিলো বেস-পেয়ারের মধ্যে হয়ে থাকে। যা এ ধরনের আরএনএ ভাইরাসের মধ্যে সর্ববৃহৎ।

করোনাভাইরাস প্লিওমরফিক গোলাকার কণাসদৃশ। ভাইরাস কণার ব্যাস প্রায় ১২০ ন্যানোমিটার। অন্য ভাইরাসের মতই করোনাভাইরাসেরও জেনেটিক ম্যাটেরিয়াল এবং জেনেটিক ম্যাটেরিয়ালকে ঘিরে নিউক্লিওক্যাপসিড বিদ্যমান থাকে। সাথে নিউক্লিওক্যাপসিডের বাইরে লিপোপ্রোটিনের একটি বহিরাবরণ রয়েছে। সবচেয়ে বাইরের এ অংশে থাকে গদাকৃতির গ্লাইকোপ্রোটিনের স্পাইক বা কাঁটা- যেগুলোর সাহায্যে ভাইরাসটি জীবন্ত কোষের রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হয়ে সংক্রমণ ঘটায়। করোনাভাইরাসের জেনেটিক ম্যাটেরিয়ালটি হলো একটি একসূত্রক রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড বা আরএনএ। জীবন্ত কোষের ভেতরে প্রবেশ করে ভাইরাসটি আরএনএর প্রতিলিপি তৈরি করে বংশ বিস্তার করে। আর লিপিড স্তরটি ভাইরাসের অন্যান্য অংশকে ধরে রাখতে সাহায্য করে।

করোনাভাইরাসের জিনোম সর্বমোট ২৯টি প্রোটিন উৎপন্ন করে বলে বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত জানতে পেরেছেন। এ ২৯টি (হয়তো বা আরও অনাবিষ্কৃত প্রোটিন) প্রোটিনই পোষক কোষের কোষীয় অঙ্গাণুকে কব্জা করে ভাইরাসের নিজস্ব অজস্র কপি তৈরি করে এবং সব পোষক দেহে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে এরা পোষক দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা অনাক্রম্য ব্যবস্থাকে ক্রমে ক্রমে দুর্বল করে দিতে শুরু করে। পোষক দেহের প্রোটিন তৈরির কোষীয় সরঞ্জাম ব্যবহার করে জিনোম সিকোয়েন্সের কোডিংয়ের মাধ্যমেই শুরু হয় করোনাভাইরাসের নিজস্ব কপি তৈরির প্রক্রিয়া এবং এতে ভাইরাসের নিজস্ব প্রোটিনও অংশগ্রহণ করে থাকে।

করোনাভাইরাসে মোট তিন প্রকারের প্রোটিন থাকে, যেমন-

গাঠনিক প্রোটিন: এরা ভাইরাসের কোষদেহের দৈহিক গঠনের মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। যেমন- সব প্রজাতির করোনাভাইরাসে সাধারণত স্পাইক (এস), এনভেলপ (ই), মেমব্রেন (এম) এবং নিউক্লিওক্যাপসিড (এন) নামক চার ধরনের গাঠনিক প্রোটিন দেখা যায়। ভাইরাল আচ্ছাদনে বিদ্যমান লিপিড বাইলেয়ারে মেমব্রেন (এম), এনভেলপ (ই) এবং স্পাইক (এস) কাঠামোগত অ্যাংকর প্রোটিন থাকে। করোনাভাইরাসগুলোর একটি উপসেট (বিশেষত বিটাকরোনাভাইরাস ‘সাবগ্রুপ এ’র সদস্যদের) হিমাগ্লুটিনিন অ্যাস্টেরেস নামে একটি সংক্ষিপ্ত স্পাইক জাতীয় পৃষ্ঠ-প্রোটিন রয়েছে।

অগাঠনিক প্রোটিন: এসব প্রোটিন ভাইরাসের মূল দৈহিক গঠনের কোনো ভূমিকা রাখে না। বরং এরা উৎসেচক এবং নানা কোষীয় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে থাকে। যেমন এনএসপি১ থেকে এনএসপি১৬ পর্যন্ত প্রোটিন, ওআরএফ১এবি প্রোটিন ইত্যাদি।

সাহায্যকারী প্রোটিন: এসব প্রোটিন ভাইরাসের নানা গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় কাজে সাহায্য করে থাকে। যেমন- ওআরএফ৩এ, ওআরএফ৬, ওআরএফ৭এ, ওআরএফ৮, ওআরএফ১০ ইত্যাদি প্রোটিন।

যদিও করোনাভাইরাসের অনেক প্রজাতি আছে। তার মধ্যে মাত্র সাতটি প্রজাতি মানুষের দেহে রোগ সংক্রমণ করতে পারে। এদের মধ্যে চারটি প্রজাতি সারা বছর ধরে অত্যন্ত সাধারণ হাঁচি, কাশি, সর্দির উপসর্গ সৃষ্টি করে। এরা হলো ২২৯ই (আলফা করোনাভাইরাস), এনএল৬৩ (আলফা করোনাভাইরাস), ওসি৪৩ (বিটা করোনাভাইরাস) এবং এইচকেইউ১ (বিটা করোনাভাইরাস)।

এ ছাড়া মার্স-কোভ একটি বিটা করোনাভাইরাসের মিউটেটেড স্ট্রেইন। যা থেকে ২০১২ সালে মিডল ইস্ট রেস্পিরেটরি সিন্ড্রোম বা মার্স ছড়িয়েছিল। সার্স-কোভও একটি বিটা করোনাভাইরাসের স্ট্রেইন। যা অতি তীব্র শ্বাসকষ্ট জনিত রোগ বা সার্স ছড়িয়েছিল। প্রথম ২০০২ সালে চীন দেশে এ রোগ দেখা গিয়েছিল। মৃত্যুর হার ছিল প্রায় ১০%। তবুও এ রোগকে দ্রুত বশে আনা গিয়েছিল। কারণ মানুষ থেকে মানুষে তার সংক্রমণের হার ছিল কম। সব মিলিয়ে মোট ৮ হাজারের কাছাকাছি রোগী এ রোগে আক্রান্ত হয় এবং প্রায় ৮শ মানুষের মৃত্যু হয়।

গবেষণায় প্রমাণিত হয়, একধরনের গন্ধগোকুল প্রজাতির প্রাণি থেকে এ ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছিল। তৃতীয় আরেকটি মিউটেটেড টাইপ সার্স-কোভ-২ কেই নভেল করোনাভাইরাস বলা হয়। যার সাথে আগের সার্স-কোভের প্রায় ৮০% মিল রয়েছে। এ সার্স কোভ-২ মানুষের শরীরে কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস ডিজিজ সংক্রমিত করছে। এ ভাইরাসকে নভেল বা নতুন বলা হচ্ছে। কারণ এ সংক্রামকটি এর আগে কখনো মানুষের মধ্যে ছড়ায়নি। মানুষ থেকে মানুষে এর সংক্রমণের হার প্রচণ্ড বেশি।

সমস্ত পৃথিবীই এখন এ বিশ্ব মহামারীতে ধুঁকছে। ভাইরাসটির সংক্রমণ সব বয়সের মানুষের মধ্যে হলেও যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং যারা বয়স্ক তাদের ক্ষেত্রে এ রোগে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

সূত্র : জাগো নিউজ

  • 82
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    82
    Shares
  •  
    82
    Shares
  • 82
  •  
  •  
  •  
  •